রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৬ অপরাহ্ন
ব্যাংক খাতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৭৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৯৮ হাজার ১৬৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। যা মোট ঋণ বিতরণের ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
গত মার্চে খেলাপি ছিল ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন হাজার ৭৯ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরের তুলনায় গত জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ‘ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এই প্রতিবেদনটি অনুমোদন করেছেন।
এর আগে গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। গত এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত বেড়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। গত মার্চে মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণ পরিমাণে বাড়লেও শতকরা হিসাবে সামান্য কমেছে। বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বাড়ায় শতকরা হিসাবে সামান্য কমেছে।
গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কমাতে হলে ঋণের মান বাড়াতে হবে। ব্যাংকগুলোকে সতর্কভাবে ঋণ দিতে হবে। জাল জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে। যারা জাল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে যেসব ঋণ খেলাপি হচ্ছে সেগুলোর প্রায় সবই জাল জালিয়াতির মাধ্যমে বিতরণ করা। সেগুলো পরিশোধের সময় আর শোধ হচ্ছে না। ফলে খেলাপি হচ্ছে। এ ছাড়া করোনার কারণে ব্যবসা বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কিছু ঋণ খেলাপি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনলে ঋণ খেলাপি হওয়ার প্রবণতা কমে যাবে। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো হবে। খেলাপির দুর্নাম থেকে দেশের ব্যাংকিং খাত রক্ষা পাবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর্থিক খাত নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। খেলাপি ঋণের কারণে বেড়ে যাচ্ছে দেশের ব্যবসা খরচ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন মাস অন্তর খেলাপি ঋণের যে হিসাব তৈরি করে, তাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। এর সঙ্গে অবলোপন করা আরও প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের অঙ্ক আরও বেড়ে যাবে। এ ছাড়া পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন আছে বিপুল অঙ্কের ঋণ। এর বাইরে আরও লাখ কোটি টাকার মতো আছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট বা এসএমএ ঋণ, যা খেলাপি হওয়ার আগের ধাপে আছে। এর বাইরে আরও অনেক ঋণ খেলাপির পর্যায়ে আছে, অথচ ব্যাংকগুলো সেগুলোকে খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করেনি। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের অঙ্ক অনেক বেশি হবে।
এদিকে করোনার কারণে খেলাপি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ ছাড় শুরু হয়েছে। প্রথম বছরে সব ঋণেরই ছাড় ছিল। তবে গত ১ জানুয়ারি থেকে সব ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়নি। তবে বড় বড় ঋণের ক্ষেত্রে চলতি আগস্ট পর্যন্ত ওই ছাড় বহাল রয়েছে। এই ছাড়ের পরও ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের অঙ্ক বেড়ে যাচ্ছে। আগস্টের পর ছাড়ের সময়সীমা আর না বাড়ানো হলে খেলাপি ঋণ আগামীতে আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ করনা পরবর্তীতে ব্যবসা বাণিজ্য এখন স্বাভাবিত গতিতে ফিরে আসেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ ৪৩ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ২০ দশমকি ৬২ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৯ হাজার ১৯১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোতে খেলাপির পরিমাণ দুই হাজার ৪৯২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে এর পরিমাণ তিন হাজার ৬৮৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। খেলাপি ঋণের অঙ্কের দিক থেকে আগে সরকারি ব্যাংকগুলো উপরে থাকলেও এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলো এগিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের অঙ্ক বেশি। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণও বেশি। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে। এ কারণে এ খাতে খেলাপির অঙ্ক বেড়েছে। তবে শতকরা হারে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার কম।
প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, গত জুন পর্যন্ত সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর স্থিতির পরিমাণ ৯ লাখ চার হাজার ৬৫৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।